ছোট ছোট সাফল্যে বড় অর্জন

ছোট ছোট সাফল্যে বড় অর্জন

দেশজুড়ে

নাটোরের এন এস সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিন। তার বাবা আবুল কাশেম কাঁচামাল ব্যবসায়ী। বছর দু’য়েক আগে বাবা অসুস্থ হওয়ার পর অর্থাভাবে সাবিনার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তখন সে এইচএসসির শিক্ষার্থী। এক বান্ধবীর কাছে তখন জানলেন সরকারের আইসিটি বিভাগ থেকে লার্নিং এন্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় ফ্রি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ৬ মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই উপার্জন করতে পারবেন। সেই শুরু। শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবিশন সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই উপার্জন শুরু করেছেন।

আলাপকালে সাবিনা বলছিলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি এখন আমি প্রতিমাসে তিন থেকে চারশো ডলার উপার্জন করি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোনের পড়ালেখার ব্যয় দেওয়াসহ সংসারেও বাবাকে সহযোগিতা করেন সাবিনা। ফ্রিল্যান্সিং করে এখন ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আয় করছেন তিনি। তার এই কাজে প্রশিক্ষকরা সহযোগিতা করছেন।

এমন হাজারো সাবিনা আইসিটি বিভাগের লার্নিং এন্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামে বসেই উপার্জন করছে শত শত ডলার। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা ঘোষণা করেন। নির্বাচনে জয়ের পর ২০০৯ সালের প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের তত্ত্বাবধানে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হয়। তখন থেকেই ডিজিটাল বাংলাদেশে দিনবদলের যাত্রা শুরু। সেই যাত্রা শেষ হচ্ছে আগামী ৩১ ডিসেম্বর।

এই রোডম্যাপের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে সেটা দেখতে সম্প্রতি রাজশাহী, যশোর, নাটোরসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রযুক্তির ব্যবহারে বহু মানুষের দিনবদলের গল্প। আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে এখন দেশে সাড়ে ৬ লাখ মানুষ ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন।

ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারে দেশে রেমিটেন্স এখন দিনদিন বাড়ছে। করোনা মহামারির মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই অর্থবছরে দুই হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসে দেশে, যা আগের অর্থবছরের থেকে ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার বা ১৫ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। তার আগের মাস জুলাইয়ে এসেছিল ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১৫ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা।

প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের রেমিটেন্সকে আরও বাড়িয়ে নিতে দেশ থেকেই রেমিট্যান্স যুদ্ধে নেমেছেন লাখ লাখ তরুণ। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করে অনলাইন ট্রান্সফারের মাধ্যমে তারা দেশে আনছেন তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। ফলে একদিক থেকে তারা যেমন নিজেদের সাবলম্বী করছেন, তেমনি বৃদ্ধি করছেন দেশের রেমিট্যান্স আয়। এই খাতে এখন ঘটে চলেছে নীরব বিপ্লব।

রাজশাহীর একজন সফল উদ্যোক্তা ফ্লিট বাংলাদেশের সিইও খাইরুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, রাজশাহীর বর্তমান পরিবর্তন অনেকের ভাবনাতীত ছিল। রাজশাহীতে কোনো শিল্প কারখানা নেই, যে কারণে বেকারত্ব পিছিয়ে রেখেছিল নগরকে। বর্তমানে রাজশাহীতে ডিজিটাল বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। আমার কোম্পানিতে কাজ করে মাসে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছে এমন স্টাফের সংখ্যা উলে­খ করার মতো। তিনি বলেন, আমরা অ্যামাজন, ওয়ালমার্টের মতো বেশকিছু ওয়ার্ল্ড জায়ান্টের স্টোর ম্যানেজমেন্টের কাজ করছি রাজশাহীতে বসে। আমাদের তরুণরা দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করছে।

আমাদের কোম্পানিতে এখন ৫৫৩ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। অনেক স্টাফের রোজগার নামি-দামি কোম্পানির সিইওয়ের চেয়েও বেশি। অনেক কলেজ ছাত্রী মাসে দুই-তিন লাখ টাকার ওপরে আয় করছেন যা অন্য চাকরিতে চিন্তারও বাইরে। তারা এই আয় করছে নিজের বাড়িতে বসে। এতে একদিকে যেমন এই মানুষগুলো নিজেদের স্বাবলম্বী করছেন, তেমনি বিদেশের টাকা দেশে এনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন রেমিট্যান্স খাতেও।

রাজশাহী টেক লিমিটেডের সিইও মাহফুজ রহমান ইত্তেফাককে বলেন, হাই স্পিড নেট বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে রাজশাহীতে। সারাদেশের ইউনিয়নে ব্রডব্যান্ড কানেকশন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে। আগে কাজ শুরু করার পর হঠাৎ নেট স্পিড ডাউন হয়ে যেত, এতে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হতো। কলকারখানা কিংবা নগরায়নের প্রভাব ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। কিন্তু সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের উদ্যোগ প্রতিটি গ্রামকে বদলে দিয়েছে। এখন মোবাইল গেমস তৈরির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তার মতে, বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় দর কম হওয়ায় উদ্যোক্তারাও বাংলাদেশে কাজ দিচ্ছে।

ছিল জেলখানা, এখন সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্র :

খুনি, চোর, ডাকাত, দুর্নীতিবাজ, রাজনৈতিক কারণসহ বিভিন্ন অপরাধে বন্দিদের থাকার জায়গা জেলখানা। নাটোরে সেই পরিত্যাক্ত জেলখানা এখন সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন মাসে হাজার হাজার টাকা আয় করছেন অনেকে। পড়ালেখার পাশাপাশি কেউ কেউ মাসে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন। কেউ হয়েছেন উদ্যোক্তা। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থেকে অর্ডার পেয়ে কাজ করছেন আগের সেই জেলখানায় বসে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের সুবিধা খুলে দিয়েছে বন্দিদশা। অনেকে বেকারত্ব থেকে মুক্ত হয়েছেন। কেউ দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে স্বস্তি পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ তৈরি করছেন শত শত নতুন উদ্যোক্তা।

নাটোরে ‘শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার’ তৈরি করা হয়েছে পরিত্যাক্ত জেলখানায়। প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে কেউ ওয়েবসাইট ডিজাইন, কেউ লোগো ডিজাইন, কেউ তৈরি করছে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, কেউবা টিশার্টের ওপর লেখা ডিজাইন করছেন, গ্রাফিক ডিজাইন, ডাটা অ্যান্ট্রি বা কেউ হয়ে উঠছেন ইউটিউবার। আবার ওয়েব অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট করে কেউ গড়ছেন ক্যারিয়ার।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ইত্তেফাককে বলেন, ‘ওই জেলখানায় আমিও বন্দী ছিলাম রাজনৈতিক কারণে। এখন পুরনো সেই জেলখানা বিশ্ব বাতায়ন কেন্দ্র। সেখানে শত শত ছেলে মেয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে আইটি খাতে কাজ করছে। এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের কারণে। তাদের সেই রূপকল্প বদলে দিয়েছে বাংলাদেশ। তাদের দূরদর্শিতার কারণে আমরা এখন একটি মেধাভিক্তিক সমাজ নির্মাণ করছি।

Hits: 0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *